বরিশালের ঐহিহ্যবাহী পিঠা পুলি

হাতের কাঁকন দিয়ে কেনা দাসী কাঁকনমালার কূটবুদ্ধিতে পরাজিত হলে রাণী কাঞ্চনমালার জীবনে নামে ঘোর অমানিশা। দুঃখী কাঞ্চনমালার কপালে বেজায় কষ্ট তখন। কিন্তু পাটরানির আভিজাত্য তো আর চলে যায়নি! হারানো সম্মান ফিরে পেতে কাঞ্চনমালাকে নামতে হয়েছিল পিঠা তৈরির এক অদ্ভুত যুদ্ধে। শেষে এক সুতাওয়ালার সাহায্যে চন্দ্রপুলী, মোহনবাঁশি, ক্ষীরমুরলী পিঠা বানিয়ে কাঞ্চনমালা প্রমাণ করেন যে তিনিই প্রকৃত রাণী!। ভোজনপ্রিয় বাঙালির খাবার তালিকায় পিঠা-পুলির স্থান শীর্ষেই বলা চলে। শীত এলে তো কথাই নেই। বাসাবাড়ির পাশাপাশি বাজারে বসে পিঠা বিক্রির ধুম। বরিশালের ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক পিঠা নকশী, সাজ, নারিকেল পুলি, তেলে ভাজা, জামাই পিঠা, লবঙ্গ লতিকা, পাটিসাপটা ও মজাদার ঝালের পিঠার দোকানে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। এ ছাড়াও বিবি খানা পিঠা , হাতে কাটা চুই পিঠা, দুধ লাউ ছিটানো পিঠা, পুরে ভরা পাকন পিঠা, শাহী মালা ইকজা, শাহী মালাই পুলি, সরের চালতা পিঠা, সানার আপেল ও রসুন পিঠা, খেজুর পিঠা, হৃদয় হরন পিঠা, রস গজা পিঠা, চন্দ্রকুলি পিঠা, দুধ খেজুর, ক্ষির তরি, রস বড়া, নারকেলের টিকিয়াসহ বিভিন্ন স্বাদের মিষ্টি ও ঝাল পিঠা বরিশালসহ সারা দেশের মানুষের রসনা তৃপ্ত করেছে যুগ যুগ ধরে। ‘বাঙালির ঐতিহ্য প্রবাহেরই একটি অংশ হচ্ছে পিঠা। এ দেশের লোকসংস্কৃতিরও অংশ সবার প্রিয় এই খাদ্যটি। আর পিঠাশিল্পীদের বানানো প্রতিটি পিঠায় থাকে প্রাণের ছোঁয়া, মিশে থাকে আবেগ, এটি পৃথিবীতে বিরল।

পিঠা বাংলাদেশের এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, লোকজ খাবার। পিঠা’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘পিষ্টক’ শব্দ থেকে৷ আবার পিষ্টক এসেছে ‘পিষ্’ ক্রিয়ামূলে তৈরি হওয়া শব্দ ‘পিষ্ট’ থেকে৷ পিষ্ট অর্থ চূর্ণিত, মর্দিত, দলিত। হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষ বইয়ে লিখেছেন, পিঠা হলো চাল গুঁড়া, ডাল বাটা, গুড়, নারিকেল ইত্যাদির মিশ্রণে তৈরি মিষ্টান্নবিশেষ। বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশষ্য ধান। ধান থেকে চাল এবং সেই চালের গুঁড়ো পিঠা তৈরির মূল উপাদান। ভারতীয় উপমহাদেশে পিঠা খাবার প্রচলন অনেক প্রাচীন। এদেশের পল্লী অঞ্চলে সুপ্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে নানা ধরনের পিঠা তৈরি ও তা দিয়ে আপ্যায়নের রীতি। পিঠা শুধু লোকজ খাবারই নয়, এক অনবদ্য গ্রামীণ শিল্প। একেক পিঠার একেক গড়ন, অনবদ্য কারুকাজ ও স্বাদের বাহার। বাংলাভাষায় লেখা কৃত্তিবাসী রামায়ণ, অন্নদামঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, মনসামঙ্গল, চৈতন্যচরিতামৃত ইত্যাদি কাব্য এবং ময়মনসিংহ গীতিকার কাজল রেখা আখ্যানের সূত্র ধরে গত আনুমানিক পাঁচশ’ বছর সময়কালে বাঙালি খাদ্যসংস্কৃতিতে পিঠার জনপ্রিয়তার কথা উল্লেখ করা যায়। যেহেতু প্রাচীন বইপুস্তকে পিঠার কথা এসেছে, তাই ধরে নেওয়া যায়, পিঠা খাবার প্রচলন বাঙালি সমাজেও অনেক প্রাচীন। একুশ শতকের শহুরে জীবনে সারা বছরই প্রায় পিঠা খাওয়া হয় দোকান থেকে কিনে। কিন্তু গ্রামীণ পরিসরে সারা বছর পিঠা খাওয়ার প্রচলন নেই। সেখানে শীতই হচ্ছে পিঠা বানানোর আদর্শ সময়। নবান্ন করার পর ধীরেসুস্থে জাঁকিয়ে শীত পড়লে পৌষের সংক্রান্তিতে পিঠা তৈরির আয়োজন করা হয়। তারপর বসন্তের আগমন পর্যন্ত চলে হরেক পদের পিঠা খাওয়া। মূলত মাঘ আর ফাল্গুন এই দুই মাসই জমিয়ে পিঠা খাওয়া হয়। এর পরে আর পিঠার স্বাদ পাওয়া যায় না ঠিকমতো। নতুন ধান থেকে তৈরি চালে যে সুঘ্রাণ আর আর্দ্রতা থাকে, পিঠা বানানোর আটা তৈরিতে সেই চাল আদর্শ। বরিশালের বিজয় গুপ্তের মনসামঙ্গলে পাই নানা প্রকার পিঠার বর্ণনাঃ
‘মিষ্টান্ন অনেক রান্ধে নানাবিধ রস।
দুই তিন প্রকারের পিষ্টক পায়েস ॥
দুগ্ধে পিঠা ভালো মতো রান্ধে ততক্ষণ।
রন্ধন করিয়া হৈল হরসিত মন ॥

একসময় ফুলপিঠা, পাক্কন পিঠা ছাড়া বিয়ে-শাদী, সুন্নত দেয়া, কুটুমবাড়ি যাওয়া ইত্যাদি সামাজিক আচার ভাবাই যেত না। বিয়ের পরে মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় গুড়-মুড়ি-চিড়ে, পান-সুপারির সঙ্গে আর যা পাঠানো হতো তা হলো বিশাল ডালাভর্তি অথবা রঙিন হাঁড়িভর্তি ফুল পিঠা। বিয়ে বা সুন্নতের বাড়িতে আত্মীয় স্বজন, নাইওরি যারা আসতেন তারাও বড় বড় হাঁড়ি ভর্তি করে পিঠা নিয়ে আসতেন। সারা বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী পিঠা। সব অঞ্চলের পিঠাতেই নিজস্ব লোকঐতিহ্য আছে। তবে ‘বরিশালের মেয়েরা পিঠা তৈরিতে আরও বেশি পারদর্শী। বাংলাদেশের বিস্তীর্ন জনপদে ঠিক কত পদের পিঠা প্রস্তুত হয় তার সঠিক কোনো হিসাব নেই। তবে বরিশালের কিছু ঐতিহ্যবাহী পিঠার খোঁজ দিব আজ আমার এই পর্বে। প্রথমেই

চিতই পিঠাঃ

বাংলাদেশের সব অঞ্চলের ধনী-দরিদ্র সবার কাছেই এ পিঠা পরিচিত ও প্রিয়। চিতই পিঠার ব্যাপকতা দেখা যায় শহরের অলিগলিতেও। শীতকালে তো বটেই বছরের অন্যান্য সময় এই পিঠা তৈরি করা হয়। অনেক রকম ভর্তা দিয়ে এই পিঠা খাওয়া হয়; আবার মাংসের ঝোল, কলিজা ভুনা, হাঁস ভুনার সাথেও দিব্যি চলে চিতই পিঠা। গ্রামাঞ্চলে চিতই পিঠা তৈরির ছাঁচ পাওয়া যায়। অঞ্চলভেদে এই ছাঁচও হয় নানারকম। কোথাও মাটির আবার কোথাও লোহার তৈরি ছাঁচে তিন পিঠা, পাঁচ পিঠা, সাত পিঠা পর্যন্ত করা যায়। এই ছাঁচগুলোতে বিভিন্ন আকৃতির যেমন গোল, ডিম্বাকৃতি, অর্ধচন্দ্রাকৃতি, হৃদয়াকৃতি পিঠা বানানো যায়। পিঠার গোলা গরম ছাঁচে পরিমাণ মতো ঢেলে ঢাকনি দিয়ে ছাঁচটি ঢেকে দিতে হয় যেন গরম বাষ্প বের হতে না পারে। কয়েক মিনিট পর পিঠাটি খুন্তি বা অন্য কিছুর সাহায্যে তুলে নিতে হয়। অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত এই পিঠা দেখতে অনেকটা প্যানকেকের মতো। কথিত আছে, একবার এক ইংরেজ এই চিতই পিঠা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন, পিঠার ভিতর এত ছিদ্র কীভাবে করা হলো! চিতই পিঠা খেজুরের রস/খেজুরের রসযুক্ত দুধে ভিজিয়ে তৈরি হয় দুধ চিতই বা ভিজা পিঠা। দুধ চিতই মূলত পৌষপার্বণ ও নবান্ন উৎসবের পিঠা। নতুন চাল কুটে পিঠা বানিয়ে খেজুরের রসে সারা রাত ভিজিয়ে শীতের হিম ভোরে এই পিঠা না খেলে শীতকালটা ঠিক জমে না।
প্রস্তুত প্রনালী
চাল সারারাত জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এরপর চালের জল ঝরিয়ে নিতে হবে। এবার সব উপকরণ একসাথে খুব ভাল ভাবে ব্লেন্ড করে একেবারে সুক্ষ্ণ মিশ্রণ বানাতে হবে। খুব ঘন অথবা পাতলা করা যাবে না। মাঝামাঝিতে রাখতে হবে। প্রথমে মাঝারি হাই হিটে প্যান গরম করে নিয়ে ব্লেন্ডার এর জগ থেকে সরাসরি একটা পিঠার মাপে মিশ্রণ ঢালতে হবে। এবার পিঠা ঢেকে দিন। ৩০ সেকেন্ড পর পিঠা ফুলে উঠলে ঢাকনা তুলে নিন। চুলার তাপ কমিয়ে দিন। নিচের দিকটা কিছুটা মচমচে হলে পিঠা তুলে নিন।পরেরটা দেওয়ার আগে প্যান আবার মাঝারি তাপে ভাল ভাবে গরম করুন। তা নাহলে পিঠা ফুলবে না।নলেন গুড়ের সাথে পরিবেশন করুন।

পুলি পিঠাঃ

পুলি পিঠা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পুলি পিঠা হচ্ছে একমাত্র পিঠা, যাতে পুর দেওয়া হয় বিভিন্ন উপাদানের। আমরা ‘পিঠাপুলি’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করি মূলত পুর ছাড়া এবং পুর দেওয়া পিঠাকে একসাথে বোঝাতে৷ ‘পিঠাপুলির আয়োজন’ বলতে আমরা বুঝি, এই আয়োজনে যেমন চিতই পিঠা, তেলের পিঠা, নকশি পিঠা, দুধে বা রসে ভেজানো পিঠা থাকবে, তেমনি নারকেল বা অন্যান্য জিনিসপত্রের পুর দেওয়া ভাজা বা ভাপা পুলিও থাকবে। পুলি পিঠার প্রধান পুর হচ্ছে নারকেল। তবে অঞ্চল ভেদে নারকেলের সাথে তিল, আখ বা খেজুরের গুড়, আদা, ক্ষীর ইত্যাদির পুর দেওয়ার প্রচলন রয়েছে৷ পুলি পিঠা তেলে ভেজেও খাওয়া হয়। আবার ভাপিয়ে দুধে ভিজিয়েও খাওয়া হয়৷ এছাড়া পুলি পিঠা হাতে নকশা করে অথবা ছাঁচেও নকশা করে তৈরি করা হয়। জানিয়ে রাখি, মূলত পাটিসাপটা পিঠাও উৎসগতভাবে পুলিপিঠার অন্তর্গত। এটাও জানিয়ে রাখি, একমাত্র ভাপা পিঠা বা ধুকি/ ধুপি পিঠা ছাড়া যে-কোনো ধরনের ভাজা বা ভাপা পিঠাকে দুধে বা রসে ভেজানো যায়।

চন্দ্রপুলি পিঠাঃ

চন্দ্রপুলি পিঠা তৈরি করা হয়। নারিকেল, চিনি বা গুড় দিয়ে তৈরি হয় পিঠা। অর্ধচন্দ্রের আকারে তৈরি এই পিঠায় মিহি করে কোরানো নারিকেল অথবা শিল পাটায় বাটা নারিকেলের সাথে চিনি বা গুড় মিশিয়ে জ্বাল দিয়ে হালুয়ার মতো আঠালো পুর তৈরি করা হয়। ময়দার কাই তৈরি করে করে রুটি বেলে তার ভিতরে নারিকেলের পুর ভরে রুটি ভাঁজ করে অর্ধচন্দ্রাকৃতির আকার দেয়া হয়।

আন্দোশা পিঠাঃ

খেজুর গুড় কিংবা আখের গুড় দুটোতেই এই পিঠা তৈরি হয়। চালের গুঁড়ায় গুড়ের শিরা মিশিয়ে তৈরি হয় পিঠার গোলা। কড়াইয়ের ফুটন্ত তেলে হাতায় করে গোলা ছাড়া হয়। কড়াইয়ের তলা থেকে ফুটন্ত পোয়া চাঁদের মতো ফুলে ঢোল হয়ে তেলের উপরে উঠে আসে। সোনালি রং ধরলে পিঠা নামানো হয়।

সেমাই পিঠা বা হাত সেমাই পিঠাঃ

পিঠা তৈরির জন্য ২ কাপ চালের গুঁড়ার সাথে ১/৪ কাপ ময়দার মিশ্রনে মণ্ড তৈরি করা হয়। তা বিশ ভাগ করে প্রতি ভাগ হাতের তালুর সাহায্যে লম্বা সরু লতার মতো করে তালুর কৌশলে দেড় থেকে দুই ইঞ্চি অন্তর কাটা হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে আবার শুধু চালের গুঁড়ার মণ্ড দিয়েই পিঠাটি তৈরি করা হয়। এই পিঠা কাটার কৌশল সবাই রপ্ত করতে পারে না। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠা মহিলারাই সেমাই পিঠা তৈরিতে বেশি পারদর্শী হন। খেজুরের গুড়, দুধ ও নারিকেল দিয়ে রান্না করা হয় এই সেমাই পিঠা। গ্রামাঞ্চলে কড়া রোদে শুকিয়ে বৈয়ামে তুলে সংরক্ষণও করা হয়। এই পিঠা আমি আমার দাদীর হাতে বানানো খেয়েছি, স্বাদ এখনো কিছুটা মনে করতে পারি। তিনি সকালের গাছ থেকে নিয়ে আসা খেজুরের রস দিয়ে এই পিঠা রান্না করতেন এবং আমাদের এক থাল করে দিতেন। ঠান্ডা বা গরম দুভাবেই খাওয়া যেতে পারে। আপনার যেমন ইচ্ছা। রাতে সেমাই পিঠা বানিয়ে সকালেও খাওয়া যেতে পারে।

পাকন পিঠাঃ

বরিশালে শীতের বিভিন্ন ধরনের পিঠার মধ্যে পাকান পিঠা অন্যতম। অনেক এলাকায় খুব জনপ্রিয় এই পিঠা। নতুন জামাই বা মেহমানদারি করতে এই পিঠার খুব কদর।

ভাঁপা পিঠাঃ

ভাঁপা পিঠা বাংলাদেশ ও ভারতের একটি ঐতিহ্যবাহী পিঠা যা প্রধানত শীত মৌসুমে প্রস্তুত ও খাওয়া হয়। এটি প্রধানত চালের গুঁড়া দিয়ে জলীয় বাষ্পের আঁচে তৈরী করা হয়। মিষ্টি করার জন্য দেয়া হয় গুড়। একসময় বরিশালে এর খুব প্রচলন থাকলেও বর্তমানে রাস্তাঘাটে এমনকী রেস্তোরাঁতে ভাঁপা পিঠা পাওয়া যায়।
ভাপা পিঠার উপকরণঃ চালের গুড়া ১ কেজি, – গুড় ২৫০ গ্রাম (আধ ভাঙা করে নিবেন), – নারিকেল ১ টি কুড়ানো, – স্টিলের বাটি ১ টি, – পাতলা ৪ কোনা ওয়ালা কাপড় ১ টি, – চালনি ১ টি, – ভাপা পিঠার হাড়ি।
প্রস্তুত প্রণালিঃ
চালের গুড়ার সাথে আন্দাজ মত লবন ও পানি দিয়ে মাখাতে হবে ঝুরঝুরা করে। চালনির নিচে একটা পাত্র রেখে হাত দিয়ে ডলে ডলে চালের গুড়া চালতে হবে। ভাপা পিঠার হাড়িতে পানি দিয়ে চুলায় দিন।( পিঠার হাড়ি না থাকলে ঘরেই তৈরী করে নিতে পারবেন। যে কোন একটা পাতিলে আন্দাজ মত পানি দিয়ে উপরে ছিদ্র ওয়ালা ঢাকনা দিয়ে চারিদিকে আটার ডো দিয়ে ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিন যাতে ভাপ বের হয়ে না যায়) পানি ফুটে উটলে ঠিক মাজ বরাবর যেখানে ছিদ্র আছে সেদিকে ভাঁপ বের হবে।এর বাইরে অন্য কোন দিকে যদি ভাঁপ বের হয়, তাহলে আটার ডো দিয়ে বন্ধ করে দিন। এখন স্টিলের বাটিতে অল্প চালের গুড়া দিয়ে ১ টেবিল চামচ নারিকেল কুড়ানো এবং আধ ভাঙা গুড় দিয়ে তার উপর আবার চালের গুড়া দিয়ে সমান করে দিন। এবার পাতলা কাপড় পানিতে ভিজিয়ে হাত দিয়ে চেপে পানি বের করে ফেলুন এবং বাটিটার উপরে দিয়ে ঢেকে কাপড়ের চার কোনা ধরে উল্টিয়ে ভাঁপ উঠা হাড়িতে বসিয়ে দিন। আলতো ভাবে টোকা দিয়ে বাটি উঠিয়ে নিন। কাপড়ের কোনা গুলি পিঠার উপরে তুলে দিন এবং ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন। চুলার আচ মধ্যম রাখবেন। ৪ – ৫ মিনিট পর কাপড়ের কোনা ধরে বড় চামচ দিয়ে পিঠা উঠিয়ে নিন। এভাবে সব গুলো পিঠা তৈরী করুন। হয়ে গেল মজাদার ভাপা পিঠা

মুইট্টা পিঠাঃ

মুইট্টা পিঠা চাল,গুড় ও নারকেলের তৈরি। একই উপকরন দিয়ে লাঠি পিঠাও তৈরি হয়। শৈশবের স্মৃতি বলে চাতালে ধান সিদ্ধ করার সময় গৃহবধুরা লাঠি/মুইট্টা পিঠা তৈরি করতেন। এখনও গ্রামে যারা ধান সিদ্ধ করেন তারা অনেকেই এই পিঠা তৈরি করেন। আবার মাটির চুলোয় সিলভারের পাতিলে গরম পানির ভাপে এ পিঠা তৈরি করা যায়। কালের বিবর্তনে এই পিঠা এখন রাইচ কুকারে তৈরি হচ্ছে। অনেক দিন পর শ্বশুর বাড়ি এলাম। জানতে চাওয়া হল আমি কি পিঠা খাব? শৈশবের স্মৃতি হাতরে পেলাম প্রিয়জনদের হাতে তৈরি সেই সুস্বাদু মুইট্টা পিঠা।

কাটা পিঠাঃ

তিল সহযোগে নারিকেল চিনি অথবা গুর দিয়ে কাই বানিয়ে চালের গুরার পিঠার ভিতরে দিয়ে হাতে তৈরী পিঠাকে তেলে ভেজে পরিবেশন করা হয়। খেতে খুব সুস্বাদু !!

পাটি সাপটা পিঠাঃ

অনেকেরই খুব পছন্দের পিঠা পাটিসাপটা। পাটিস
পাটি সপটা পিঠা খেতেও অনেক মজা, তৈরি করাও খুব সহজ। প্রস্তুত প্রণালীঃ
দুধ জ্বাল দিয়ে কিছুটা ঘন হলে এক কাপ চিনি দিয়ে আবার জ্বাল দিতে হবে। মাঝে মাঝে নাড়তে হবে। ১ চা-চামচ চালের গুঁড়াতে অল্প দুধ মিশিয়ে বাকি দুধে ঢেলে লবণ দিয়ে নাড়তে হবে। কিছুক্ষণ পর ক্ষীর নামিয়ে নিতে হবে। এরপর চালের গুঁড়া, আটা, চিনি অথবা গুড়, লবণ এবং পানি মিলিয়ে মসৃণ গোলা তৈরি করে নিবেন। পানি এমন পরিমানে দিতে হবে যেন বেশি পাতলা বা বেশি ঘনও না থাকে। তারপর তাওয়ায় সামান্য তেল দিয়ে বড় গোল ডালের চামচে এক চামচ গোলা তাওয়ায় দিয়ে ছড়িয়ে দিবেন। উপরের অংশ শুকিয়ে এলে একপাশে এক টেবিল চামচ ক্ষীর রেখে পিঠা মুড়ে চ্যাপ্টা করে দিতে হবে। খুব সহজেই হয়ে গেলো মজাদার পাটিসাপটা।

কলাপাতায় তালের পিঠাঃ

তাল দেশি এই ফলটি যেমন মিষ্টি তেমনই এর সুঘ্রাণ। গুণে ভরা মৌসুমি এই ফলটি অনেকেরই প্রিয়। তাল দিয়ে বানানো যায় হরেক রকম মজার পিঠা। কলাপাতায় তালের পিঠা বরিশালের গ্রাম গঞ্জে একটি মজাদার জনপ্রিয় পিঠা। এই পিঠা তৈরী করতে যা লাগবেঃ তালের গোলা ১ কাপ, চালের গুঁড়া ২ কাপ, চিনি পরিমাণমতো, এলাচ গুঁড়া কোয়ার্টার চা চামচ, পানি আধা কাপ, কলাপাতা ১০-১২টা।
যেভাবে করা হয়ঃ তালের গোলা, চালের গুঁড়া, চিনি, এলাচ গুঁড়া, পানি দিয়ে গোলা করতে হয়। গোলা শক্ত আবার নরমও হবে না। এবার কলাপাতা বিছিয়ে একপাশে গোলা দিয়ে গোল রুটির মতো বা লম্বা করে দিয়ে আর একটা কলাপাতায় ঢেকে চুলায় তাপ দিতে হয়। দুই পাশ উল্টে ৭-৮ মিনিটের মধ্যেই হয়ে যাবে মজাদার কলাপাতার তালের পিঠা। কলাপাতা খুলে গরম বা ঠাণ্ডা করে পরিবেশন করা যায়।

তালের বড়াঃ

তালের পিঠাগুলোর মধ্যে বড়া তৈরি করাটা বেশ সহজ। খুব সহজেই তৈরি করা যায় বলে গৃহিণীরাও বিকেলের নাস্তা হিসেবে তালের বড়া তৈরি করতে ভালোবাসেন তালের মৌসুমে। তালের বড়া তৈরী করার উপকরণঃ
তালের পাল্প ১ কাপ, চালের গুঁড়া ২ কাপ, নারিকেল ৩ টেবিল চামচ (কোড়ানো), চাঁপাকলা ২ টা, গুঁড়া দুধ ২ টেবিল চামচ, বেকিং পাউডার সিকি চা চামচ, পানি পরিমাণমতো, ভাজার জন্য তেল পরিমাণমতো, চিনি পরিমাণমতো।
প্রস্তুত প্রণালিঃ
তাল চিপে রস বের করে একটা পাতলা কাপড়ে রেখে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখুন ৫-৬ ঘণ্টা। এবার ভাজার জন্য তেল বাদে অন্য সব উপকরণ একসাথে ভালো করে মেখে আধা ঘণ্টা ঢেকে রাখুন। তারপর কড়াইতে তেল দিয়ে গরম হলে মাখানো মিশ্রণ থেকে বড়ার আকারে ৭-৮ করে দিয়ে ডুবো তেলে সোনালি করে ভেজে নিন। সবগুলো বড়া ভাজা হয়ে গেলে পরিবেশন পাত্রে ঢেলে গরম গরম পরিবেশন করুণ মজাদার তালের বড়া। আর তাই আজই তৈরি করে নিন সহজ এই রেসিপিটি।

চালের রুটি পিঠাঃ

শীতের দিনে কোন খাবার খাবেন, বাঙালিকে সেটা বলে কোনো লাভ নাই। কারণ প্রবাদ বলে, বাঙালি খাদ্যরসিক জাতি। রসেবশে থাকতেই ভালোবাসে তারা। সুখের দিনেও তাদের খাবার লাগে, এন্তার দুঃখকষ্ট ভুলতে ওই খাবারই লাগে। গ্রাম কিংবা শহর সবখানেই খাবার টেবিলে চালের আটার রুটির একটা আলাদা কদর আছে। বিভিন্ন উৎসবেও আমরা চালের আটার রুটি তৈরী করে থাকি।কোরবানি ঈদের পরদিন সকালবেলা নাস্তায় চালের রুটি বা চিতই পিঠার সাথে কোরবানির মাংস খাবার মজাই আলাদা।শীত মানেই চালের আটা দিয়ে বানানো ছিটা পিঠা আর হাঁসের মাংস ভুনার কথা।

চালের ছিটা রুটি পিঠাঃ

শীতকালে এই রুটি গুড় দিয়ে খেতে দারুন লাগে।তবে ঝাল ঝাল মাংস দিয়েও কম যায় না। মুরগি, গরু কিংবা খাসি যেকোনো মাংসের ঝোলের সঙ্গে ছিটা রুটি পিঠা খাওয়ার স্বাদই আলাদা। শীত এলেই মজাদার এ ছিটা রুটি পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যায়। এটি তৈরি করাও বেশ সহজ। দেখতেও যেমন সুন্দর; খেতেও তেমনই মজাদার ছিটা রুটি। চালের গুড়ার মিশ্রণে হাত চুবিয়ে তাওয়া বা প্যানের উপর ছিটিয়ে তৈরি করা হয় বিশেষ এ রুটি। যে কারণে এর নাম ছিটা রুটি। কেউ আবার ছটকা রুটি বা ছিটরুটিও বলে থাকেন। শুধু মাংসের ঝোলেই নয়; খেজুরের গুড়েও চুবিয়ে খাওয়া যায় ছিটা রুটি। তা ছাড়া সালাদ, কিংবা নারকেল কোরানো দিয়েও খেতে পারেন। ভোজন বিলাসী মানুষ একবার এ পিঠার স্বাদ গ্রহন করলে বারবার এর স্বাদ গ্রহনের জন্য আকুল হয়ে উঠবেন। আজ এ পর্যন্ত! সবাই ভালো থাকবেন। সাবধানে থাকবেন। করোনা থেকে রেহাই পেতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।

© নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম:-&ফেসবুক-১:-&ফেসবুক-২
nuru.etv.news@gmail.com

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.