দখলমুক্ত হলো মোহাম্মদপুরের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া রাহমানিয়া মাদ্রাসা

কওমি অঙ্গনে আলোচিত ‘জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া’ মাদ্রাসাটি দখল মুক্ত হয়েছে। মাদ্রাসাটি গত কয়েক বছর ধরে একটা পক্ষের দখলে ছিলো। মাওলানা আজিজুল হকের চার ভাই যথা মামুনুল ও তার তিন ভাই-মাহফুজুল হক, মাহমুদুল হক ও মাহবুবুল হক এ মাদ্রাসার শিক্ষক। এছাড়া তাদের একাধিক ভাগিনা ও ভাতিজাসহ অন্তত ২০ আত্মীয় এখানে শিক্ষকতা করেছেন। গতকাল সোমবার (১৯ জুলাই) বিকাল সোয়া তিনটার দিকে পুলিশের সহযোগিতায় নতুন কমিটিকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয় ঢাকা জেলা প্রশাসন। ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্টেট মোঃ আব্দুল আউয়াল জানান, মাদ্রাসাটি এতোদিন অবৈধভাবে দখলদারদের কবলে ছিলো। আজকে বৈধভাবে নতুন কমিটিকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসাটি একটি ‘মসজিদ ও মাদ্রাসা’ ভিত্তিক ওয়াকফ সম্পত্তি। এই ওয়াকফ সম্পত্তির মাদ্রাসাটি গত কয়েক বছর ধরে একটা পক্ষের দখলে ছিলো। দখলদারদের সংগে বিভিন্ন মামলা মোকাদ্দমা চলমান ছিলো। (২০ বছর আগে রাতের আঁধারে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসাটি দখল করেন হেফাজতে ইসলামের নেতা মাওলানা মামুনুল হক ও তার সহযোগীরা। মাদ্রাসাটি দখল করে নেওয়ার জন্য জন্মলগ্ন থেকেই তৎপর ছিলেন তারা। মামুনুল হক একাধিকবার এটি দখল করতে ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। অবশেষে অরাজকতা সৃষ্টির মাধ্যমে মাদ্রাসা দখল করেন তিনি)। দখলদারদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে মাদ্রাসা থেকে বিতাড়িতরা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের কাছে গেলেও পুলিশ তাদের সহযোগিতা করেনি। পুলিশের অবস্থান ছিল প্রকারান্তরে দখলদারদের পক্ষেই। পরে বিতাড়িতরা আদালতে মামলা করেন। এতদিন তা নিস্পত্তির অপেক্ষায় ছিলো।) এরই মধ্যে সর্বশেষ এই মাসে ওয়াকফ প্রশাসন এটি পরিচালনার জন্য নতুন কমিটি গঠন করেছে। আমাদেরকে জেলা প্রশাসন থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন কমিটিকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে। আজকে তাদেরকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওয়াকফ প্রশাসনের চিঠি অনুযায়ী এতোদিন এই মাদ্রাসাটি অবৈধ দখলে ছিলো। তবে আমাদেরকে ওয়াকফ প্রশাসন যে ডকুমেন্ট দিয়েছিলো তাতে অবধৈ দখলদার হিসেবে কারো নাম উল্লেখ ছিলো না। কেন অবৈধ দখলদারদের অপসারণ করতে এতোদিন লাগলো এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি আমরা জানি না। এটি ওয়াকফ প্রশাসন ভালো বলতে পারবে। তবে নতুন কমিটিকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে আসা ওয়াকফ প্রশাসনের পরিদর্শক মোঃ মামুনুর রশিদ এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের সংগে কোনো কথা বলেননি।

গোড়ার কথাঃ রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার রিয়েলএস্টেট ব্যবসায়ী দুই ভ্রাতা হাজি মোহাম্মদ আলী ও হাজি নূর হোসেনের দান করা সম্পত্তিতে অত্র ঐতিহাসিক সাত মসজিদ এলাকায় ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা। ১৯৯২ সালে মাদ্রাসার তৃতীয় প্রিন্সিপাল হিসাবে মাওলানা আজিজুল হক (মামুনুল হকের বাবা) দায়িত্ব গ্রহণের পর মাদ্রাসার বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। মাদ্রাসার ছাত্রদের তিনি দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করেন। অনিয়মের কারণে ১৯৯৯ সালে প্রিন্সিপাল পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। ছাত্র মজলিস করার কারণে মাওলানা আজিজুল হকের ছেলে মামুনুল হককে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরও বসে থাকেননি পিতা-পুত্র। গোপনে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের রাজনীতিতে সক্রিয় করেন। পাশাপাশি মাদ্রাসা কমিটির বিরুদ্ধে নানা ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতে থাকেন। ১৯৯১ সালে মাওলানা আজিজুল হক সমমনা ইসলামি কয়েকটি দল নিয়ে ইসলামি ঐক্যজোট গঠন করেন। তিনি নিজে এর চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ১৯৯৯ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে যোগ দেন। ২০০০ সালের ৬ মে ও ১ জুলাই তিনি মাদ্রাসাটি দখলে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালান। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করলে জোটের শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মাওলানা আজিজুল হক মাদ্রাসা দখলে চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করেন। এরই অংশ হিসাবে ২০০১ সালের ৩ নভেম্বর রাতে মাওলানা আজিজুল হকের চার ছেলে-হাফেজ মাহমুদুল হক, হাফেজ মাহবুবুল হক, মাওলানা মাহফুজুল হক ও মাওলানা মামুনুল হক এবং নাতি মাওলানা হাসান আহম্মেদসহ বেশকিছু লোক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মাদ্রাসায় প্রবেশ করে। ওই সময় আরও যারা ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- মাওলানা আবু তাহের, ইদ্রিস আলী প্রমুখ। তারা ব্যাপক অরাজকতা সৃষ্টি করে মাদ্রাসা দখল করে নেন। মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পরই তারা মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, শিক্ষক ও পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের বিতাড়িত করেন। পরে নিজেদের লোকজন দিয়ে মাদ্রাসাটি পরিচালনা করতে থাকেন। মাদ্রাসা দখলের পর শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা আজিজুল হকের সহযোগী আব্দুল মালেককে আহ্বায়ক করে মাদ্রাসায় নয় সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।

(শায়খুল হাদীস হযরত মাওলানা আজিজুল হক)
গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী ঘোষিত কমিটির আহ্বায়ক মাওলানা আব্দুল মালেকের ছেলে হাফেজ মাওলানা আবু তাহের ২০০৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা করেন। তিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অন্যতম আসামি। মালেকের অপর ছেলে ইদ্রিস আলী এবং মেয়ের জামাই মনিরের বিরুদ্ধে হরকাতুল জিহাদের নেতা হিসাবে জঙ্গি তৎপরতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। তারা সবাই জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা দখলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। অরাজকতার মাধ্যমে ২০০১ সালে মাদ্রাসাটি দখল করে নেওয়া হলেও দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উপরন্তু দখলদারদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে। অন্য দিকে যাদের মাদ্রাসা থেকে বিতাড়িত করা হয় তারা পুলিশসহ সরকারের দপ্তরের দ্বারস্থ হন। কিন্তু তারা আইনের আশ্রয় লাভের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তাই বাধ্য হয়ে বঞ্চিতরা আদালতের স্মরণাপন্ন হন। এদিকে আদালত ও ওয়াকফ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন দফায় মামুনুল হকসহ অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করার নির্দেশনা দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাই মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয় গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। এছাড়া মাদ্রাসাটি যেহেতু ওয়াকফকৃত সম্পত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, তাই ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয় এ বিষয়ে দ্রুত একটি বৈধ আদেশ দিতে পারেন বলেও গোয়েন্দারা পরামর্শ দিয়েছে। অবশেষে ২০ বছর বাদে গতকাল সোমবার (১৯ জুলাই) বিকাল সোয়া তিনটার দিকে পুলিশের সহযোগিতায় নতুন কমিটিকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয় ঢাকা জেলা প্রশাসন।

উল্লেখ্য্ হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে গত ১৮ এপ্রিল ২০২১ তারিখে মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া মাদরাসা থেকে দুপুর ১টার দিকে গ্রেফতার করা হয়। গত ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানাধীন রয়েল রিসোর্টে নারী সঙ্গীসহ স্থানীয় লোকজনের হাতে আটক হওয়ার পর ছাড়া পেয়ে রাতেই ঢাকায় চলে আসেন তিনি। ঢাকার মোহাম্মদপুরের কাদিরাবাদ হাউজিংয়ের নিজ বাসায় না গিয়ে তিনি পাশেই জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় যান মামুনুল হক। সেখানেই অবস্থান করছিলেন। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের তাণ্ডবের ঘটনায় করা মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থানা ও ঢাকার মতিঝিল থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
সূত্রঃ দেশ রূপান্তর

সম্পাদনাঃ নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম:-&ফেসবুক-১:-&ফেসবুক-২
nuru.etv.news@gmail.com

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.