গরু রপ্তানীতে ভারতের নিষেধাজ্ঞাঃ বাংলাদেশের জন্য ‘শাপে বর’ !

২০১৫ সালের আগে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় দেড় কোটি গবাদি পশু আসতো ভারত থেকে, যার মূল্য প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় এসে হঠাৎ করে ভারতের গরু সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়। উদ্দেশ্য বাংলাদেশের মুসলমানদের গরুর গোশতের সংকটে ফেলা। মোদীর সেই অপকর্মে সাময়িক সংকটে ফেললেও ঘটনাটি ‘শাপে বর’ হয়ে গেছে। ২০১৫ সালের ১ এপ্রিল ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের এক নির্দেশনার পর সেই দেশ থেকে বাংলাদেশে গবাদি পশু রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বাংলাদেশে গবাদি পশু, বিশেষ করে গরুর মাংসের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা জেগেছিল। তবে সে আশঙ্কা সত্যি হওয়ার পরিবর্তে বাংলাদেশ মাংসের গরু উৎপাদনে স্বনির্ভর হয়ে গেছে বলে দাবি করছে সরকার এবং খামারিরা। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-তিস্তার হাজার হাজার চরে গরুর বাথান এবং গ্রামের কৃষকরা ঘরে ঘরে গরু প্রতিপালন করে দেশে গোশতের চাহিদা মিটিয়ে ভারতে উচিত জবাব দিয়েছে। ২০১৫ সালের সেই নিষেধাজ্ঞার জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. শেখ আজিজুর রহমান ভারত সরকারকে বরং ধন্যবাদই দিয়েছেন। তার মতে, ২০১৫ সালে ভারত সেই সিদ্ধান্ত না নিলে বাংলাদেশ মাংসের জোগানে স্বনির্ভর হতে পারতো না। তিনি বলেন, মোদী সরকার নিষেধাজ্ঞা না দিলে আমরা বুঝতে পারতাম না, আমাদের মধ্যে কতটা উদ্ভাবনী ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। আমাদের খামারিরা, কৃষকরা দিনরাত পরিশ্রম করে সেই ঘাটতিটা পুষিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম গরুর মাংসের কেজি এক হাজার টাকা হয়ে যাবে৷ তা কিন্তু হয়নি। (গরুর মাংসের দামে) আমরা এখন মোটামুটি সহনীয় মাত্রায় আছি। (পশুর) খাবারের দামটা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে আরো সহনীয় মাত্রায় যেতে পারতাম। বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ এমরান বলেন গবাদিপশুর খাদ্য আমদানির কাজটি মাত্র তিন ব্যক্তির হাতে বন্দি। তারা প্রতি কোরবানিতে খাদ্যের দাম বাড়ায়। সেটা আর কমায় না। পরে সারা বছর ওই দামেই বিক্রি করে। গো খাদ্যের অতিরিক্ত দামের বিষয়টি স্বীকার করেছেন প্রাণিসম্পদের মহাপরিচালকও৷ তবে তিনি বলেন, ‘‘যাদের হাতে মার্কেটটা রয়েছে, সব সময় তাদের উপর কঠোর হওয়া যায় না। কারণ, তিন মাস ব্যবসা না করলেও তাদের হবে। কিন্তু আমাদের পশু তো তিন মাস না খেয়ে থাকতে পারবে না”

বাংলাদেশে সারা বছর যত পশু জবাই হয়, প্রায় সমান সংখ্যক পশু জবাই হয় কোরবানির সময়ে। এক সময় কোরবানির বাজারসহ সারা বছরের বাজারের বড় একটা অংশ ভারত থেকে আসতো। এখন কোরবানির সময় ভারত থেকে গরু আসে না বললেই চলে। সারা বছর যা আসে, তার পরিমাণও খুবই কম। ভারত থেকে বাংলাদেশে বৈধ পণ্যের মতো গরু আনার সুযোগ কখনোই ছিল না। গরু আসতো অনানুষ্ঠানিকভাবে। ভারত থেকে গরু বাংলাদেশে ঢোকার পর দেখানো হতো, গরুগুলো মালিকানাহীনভাবে সীমান্ত এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল৷ এরপরের ধাপে সীমান্তরক্ষীরা গরুগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে আসতো৷ সেখান থেকে ৫০০ টাকা ফি দিয়ে গরুর প্রকৃত মালিকরাই গিয়ে মালিকানা দাবি করতো এবং গরু নিয়ে আসতো৷ এই পদ্ধতিটিই মোটামুটি সবচেয়ে স্বীকৃত ছিল। এর বাইরে বাঁশ-রশি দিয়ে একটা যন্ত্র তৈরি করতো চোরাকারবারিরা৷ সেটির সাহায্যে এক পাশ থেকে অন্যপাশে কাঁটাতারের বেড়ার উপর দিয়ে গরু নিয়ে যেতো তারা৷ তাছাড়া নদী-জঙ্গলে ঢাকা এলাকায় সবার চোখ এড়িয়েও গরু আসতো বাংলদেশে। এক সময় ভারত থেকে গরু আনাই ছিল সীমান্ত এলাকার বড় ব্যবসা৷ সীমান্তের অনেক মানুষ সারাদিন এই কাজে ব্যস্ত থাকতো। প্রতিদিন অন্তত এক হাজার গরু আসতো। সিপিডির করা ‘বাংলাদেশ’শ ফরমাল অ্যান্ড ইনফর্মাল এগ্রিকালচারাল ট্রেড উইথ সার্ক কান্ট্রিজ’ শীর্ষক এক পেপারে বলা হয়, অনেকের মতে, বাংলাদেশ ভারতের অনানুষ্ঠানিক এই বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার। এখন ভারত থেকে গরু আসা মোটামুটি বন্ধই বলা চলে। কিছু কিছু জায়গা দিয়ে যেখানে কাঁটাতারের বেড়া নেই, সেখানে খুবই ঝুঁকি নিয়ে কেউ কেউ গরু নিয়ে আসে। কিন্তু এর সংখ্যা এতটাই কম যে, তা ধরার মতো নয়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. শেখ আজিজুর রহমানের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ৬ লক্ষাধিক খামার আছে। ২০১৫ সালের আগে এটা ২ লাখের কম ছিল। তিনি বলেন, ‘‘আরেকভাবে এটাকে তুলনা করা যেতে পারে, ২০০৯-১০ সালে যেখানে আমরা ১২ দশমিক ৬০ লাখ মেট্রিক টন মাংস উৎপাদন করতাম। ২০১৯-২০ সালেই সেটা পৌঁছে যায় ৭৬ দশমিক ৭৪ লাখ মেট্রিক টনে। ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ৬ বছর থেকে ভারতের গরু সীমান্ত দিয়ে খুবই কম আসছে। এই সময়ে বাংলাদেশের কৃষকরা নানান পন্থায় গরু প্রতিপালন করে গবাদি পশু খাতকে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। সংকটকে কাজে লাগিয়ে চিন্তাশক্তি কর্মোদ্যমের মাধ্যমে যে সম্ভাবনার সৃষ্টি করা যায়; বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের কৃষকরা তার নজীর সৃষ্টি করেছেন। যুগ যুগ ধরে ভারতীয় গরুতে বাংলাদেশের ভোক্তাদের গোশতের চাহিদা মেটানো হলেও এখন দেশের উৎপাদিত গরুতেই চাহিদা পুরণ সম্ভব হচ্ছে।সুতরাং বলতেই হয় গরু রপ্তানীদে ভারতের নিষেধাজ্ঞা বাালাদেশের জন্য আশীর্বাদই হয়ছে
সূত্রঃ বিবিসি নিউজ

সম্পাদনাঃ নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
nuru.etv.news@gmail.com

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.