কালো টাকা সাদা করার বাজেট!!

বিশ্বে নানা রঙের টাকা (নোট) আছে। একই নোটে আছে অনেক রঙের ব্যবহার। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোথাও কালো রঙের কোনো নোটের প্রচলন হয়নি। তবুও বিশ্বজুড়ে কালো টাকা (Black Money) শব্দ যুগল ব্যাপকভাবে ব্যাবহৃত হয়। কালো টাকার বিষয়টি আসলে রুপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। সাধারণভাবে কালো টাকা বলতে এমন টাকাকে বুঝানো হয় যার উৎস বৈধ বা আইনসম্মত নয়। কালো টাকা কী, বাংলাদেশের একজন রিকশাওয়ালাও জানে, কালো টাকা কালো পথে উপার্জিত অথবা সৎভাবে উপার্জনের পর বৈধভাবে প্রকাশ না করার কারণে কালো হয়। ঘুষ, দুর্নীতি, কালোবাজারি, চোরাকারবার, মাদক ও অস্ত্রসহ নিষিদ্ধ পণ্যের ব্যবসা থেকে উপার্জিত অর্থ হচ্ছে কালো টাকা। অবশ্য আয়কর আইনে কালো টাকা বলতে কিছু নেই। আইনের কোথাও এ শব্দটির উল্লেখ নেই। সেখানে অপ্রদর্শিত অর্থের উল্লেখ আছে। আয়ের যে অংশ আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শন করা হয় না, তা-ই অপ্রদর্শিত অর্থ ( Un-disclosed Money); সাধারণভাবে যা কালো টাকা নামে পরিচিত। তবে সরকার ‘অপ্রদর্শিত’ টাকা বললেও বুদ্ধিজীবীদের একাংশ একে ‘কালোটাকা’ হিসাবে অভিহিত করে যাচ্ছে। এবং অনেক মিডিয়া একে ভয়ংকর একটি ব্যাপার বলেও প্রচার করছে। নানা কারণে কালো টাকা সমাজ ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এ অর্থ অপ্রদর্শিত থেকে যায় বলে সমাজ ও রাষ্ট্র বিরোধী কাজ ও অপরাধে ব্যবহারের অনেক বেশি আশংকা থাকে। এ অর্থ আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শন করা হয় বলে রাষ্ট্র তা থেকে কোনো কর পায় না। অন্যদিকে এ ধরনের অর্থ দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে।আমাদের দেশে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত কালোটাকার জন্ম হচ্ছে অবিরত; যেমন ছিল পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১)। এমনকি ব্রিটিশ আমলে দুর্নীতি ও কালোটাকা রোধে তৈরি হয় ‘অ্যান্টি করাপশন ব্যুরো’, যা আজ দুর্নীতি দমন কমিশন’। অতএব, দেখা যাচ্ছে, কালো টাকার জন্ম আমরা রোধ করতে পারছি না। বরং এর আকার-প্রকার বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন। এর ব্যাপকতা সর্বগ্রাসী। আবার এর একটা অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশে পাচার হয়ে। বাংলাদেশি কালোটাকার মালিকরা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দুবাই, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশ, এমনকি চীনেও হচ্ছে বিনিয়োগকারী/নাগরিক। সেসব দেশ আইন করে দুনিয়ার সব দেশের কালোটাকার মালিকদের আদর-যত্ন করে নাগরিকত্ব দিচ্ছে। আমরা যখন ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ’ আইন করে কালোটাকার মালিকদের শাস্তি দিচ্ছি, তখন তারা সভ্য ও শক্তিশালী দেশের নাগরিক। এ দেশের সুযোগ্য সন্তানরা অবৈধপন্থায় অনেক দূরের দেশ সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে ৩৭২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাংক আমানত হিসেবে রেখেছেন, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩২ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন। ইউএনডিপির সূত্রানুযায়ী ১৯৭০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে নির্বিঘ্নে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সূত্রমতে, ২০০২ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে গড়ে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেশের বাইরে উড়াল দিয়েছে। টাকা যে শুধু বাংলাদেশ থেকে বিদেশে উড়াল দিয়েছে তা নয়, বিভিন্ন দেশ বিশেষত ভারত থেকে বিদেশে টাকা পাচার হয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। সুইচ ন্যাশনাল ব্যাংকের (SNB) সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ২০১৩ সালে সুইচ ব্যাংকে ভারতীয়দের জমার পরিমাণ বেড়েছে ৪০ শতাংশের ওপরে। পূর্ববর্তী বছরে যা ছিল ১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন তা বেড়ে হয়েছে ২ বিলিয়ন সু্ইচ ফ্রাংক, যা ভারতীয় রুপিতে ১৪ হাজার কোটিরও বেশি।

বিদায়ী অর্থবছরে (২০২০-২০২১) রেকর্ড ২০ হাজার ৬০০ কোটি কালো টাকা সাদা হয়েছে। ১১ হাজার ৮৫৯ জন ব্যাক্তি কালো টাকা বৈধ করেছেন। এর মধ্যে নগদ টাকা সাদা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি। ব্যাংক বা নগদে রাখা এই বিপুল পরিমাণ টাকা সাদা করেছেন প্রায় সাত হাজার করদাতা। বাকি টাকা জমি-ফ্ল্যাট ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাময়িক হিসাবে এই তথ্য জানা গেছে। কালো টাকা সাদা করার তালিকায় আছেন চিকিৎসক, সরকারি চাকরিজীবী, তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক, ব্যাংকের উদ্যোক্তা মালিক ও স্বর্ণ ব্যবসায়ীসহ আরও অনেকে। দেশ স্বাধীনের পর কালো টাকা সাদা করা অতীতের সব রেকর্ড এবার ভেঙে গেছে। এবার অনেক বেশি কালো টাকা সাদা হওয়ার দু’টো কারণ হতে পারে যেমনঃ প্রথমত, করোনার কারণে সারা বিশ্বই আক্রান্ত৷ যারা টাকা পাচার করেন তারা এই সময়ে পাচারের সুযোগটা পাননি। ফলে তাদের কাছে যে বিশাল অংকের টাকা রয়ে গেছে সেটা সরকারের বিশেষ সুযোগের ফলে সাদা করে নিয়েছেন। আর দ্বিতীয় কারণ হল, এর আগে কখনই কোন সরকার এমন সুযোগ দেয়নি, যেটা গত অর্থবছরে ছিল। সেটা হল, কালো টাকা সাদা করলে কেউ কোন ধরনের প্রশ্ন করতে পারবে না এবং পুরো টাকার উপর মাত্র ১০ শতাংশ কর দিলেই টাকাটা বৈধ হয়ে যাবে। এটা তো বিশাল সুযোগ। বিদায়ী অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কালো টাকা সাদার করার গড় ট্যাক্স ১০ শতাংশ হিসাবে মোট ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। ২০২১-২২ অর্থ বছরের উচ্চ হারে কর আরোপ করে আরও একবছর কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

কালো টাকার মালিকরা বিশেষ সুবিধা পাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হন ব্যবসায়ীরা। বরাবরই ব্যবসায়ীরা এটার বিরোধিতা করে আসছেন। এভাবে চলতে থাকলে বৈধ ব্যবসায়ীরা ট্যাক্স দিতে অনুৎসাহিত হবেন। বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকারীরা বরাবরই বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রহিত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, এর মাধ্যমে দুর্নীতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। সরকার একদিকে সুশাসনের কথা বলছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা বার বার উচ্চারণ করছে, আবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিচ্ছে। প্রকারন্তরে এটা সরকারের দ্বিমুখী নীতির নামান্তর ছাড়া আর কিছুই নয়, এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ। তবে সরকার প্রতিবারই বলছে, বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্যই তারা এমন পদক্ষেপ নিচ্ছেন। অর্থ যাতে বিদেশে পাচার হতে না পারে এবং দেশের অর্থ দেশেই বিনিয়োগ হয়, এই বিবেচনায় তারা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ দিচ্ছেন। বাস্তবে দেখা যায় যে, এই অনৈতিক এবং অসাংবিধানিক সুযোগ দেওয়ার পরও আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায় না। কালো টাকার মালিকেরা যৎসামান্য টাকাই এ যাবৎ সাদা করেছেন। আসলে এ ধরনে সুযোগ দিয়ে দুর্নীতির বিস্তারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে বলে মনে করছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এর মতে, ‘কালোটাকা সাদা করার যে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তা চিরতরে বন্ধ করা উচিত। কালো টাকা সাদা করার যে ব্যবস্থা আইনি কাঠামোর মধ্যে করা হয় তা সাধারণ নৈতিকতা এবং সংবিধান পরিপন্থী। সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেঃ
রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না এবং যেখানে বুদ্ধিবৃত্তিমূলক ও কায়িক-সকল প্রকার শ্রম সৃষ্টিধর্মী প্রয়াসের ও মানবিক ব্যক্তিত্বের পূর্ণতর অভিব্যক্তিতে পরিণত হইবে।”কালো টাকা মূলধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হলে প্রথমেই দরকার কালো টাকা বানানোর পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া, দুর্নীতি দমন করা, বিদেশে টাকা পাচারের পথ বন্ধ করা, কালো টাকা সাদা করার আইনি পথ বন্ধ করা এবং কালো টাকাওয়ালাদের আইনের আওতায় আনা। তারপর দরকার আইনের শাসন, উন্নত শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, লাভজনক বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করা।
সূত্রঃ ২০২১-২২ অর্থ বছরের বাজেট

সম্পাদনাঃ নুর মোহাম্মদ নুরু
গণমাধ্যমকর্মী
nuru.etv.news@gmail.com

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.