৯ জুন, আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবসঃ এবারের প্রতিপাদ্য ‘আর্কাইভের ক্ষমতায়ন’

আজ আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস। সেই সূত্রে বাংলাদেশেও এই দিবসটি পালিত হচ্ছে। আর এ দেশে এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভস এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ আর্কাইভস অ্যান্ড রেকর্ডস ম্যানেজমেন্ট সোসাইটি (বারমস)। আর্কাইভস হলো ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন সরকারি ও বেসরকারি নথিপত্র, দলিলাদি, পুরনো বিরল পুস্তকাদি, পান্ডুলিপি ইত্যাদির সংগ্রহশালা। বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চা, শিক্ষা ও গবেষণা, রেফারেন্স ইত্যাদি ক্ষেত্রে জাতীয় আরকাইভসের গুরুত্ব অপরিসীম। সম্ভবত প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় আর্কাইভ জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের উদ্ভব হয় এবং মধ্যযুগেও এগুলির অস্তিত্ব বজায় থাকে। গ্রিক ‘আর্কিয়ন’ শব্দ থেকে আর্কাইভস এর উদ্ভব, যা দ্বারা বোঝায় কোনো দফতরের আয়ত্তাধীন কর্মপ্রণালী। আর্কিয়ন এসেছে ‘আর্ক’ শব্দ থেকে যা দ্বারা আবার প্রারম্ভ, উদ্ভব, সর্বময় কর্তৃত্ব, সাম্রাজ্য, ম্যাজিস্ট্রেসি, দফতর ইত্যাদি বোঝায়। ল্যাতিন ‘আর্কিভিয়াম’ এসেছে গ্রিক আর্কিয়ন শব্দ থেকে, আর ল্যাতিন থেকে এসেছে ফরাসি ল্যা-আর্কাইভ। বিভিন্ন বস্তুর সন্নিবেশ বোঝাতে ফরাসি থেকে ইংরেজি ‘আর্কাইভ’ শব্দটির উৎপত্তি। অক্সফোর্ড ইংরেজি অভিধান আর্কাইভসকে সজ্ঞায়িত করেছে এমন একটা স্থান হিসেবে যেখানে সংরক্ষণের নিমিত্ত সরকারি নথিপত্র বা ঐতিহাসিক দলিলাদি সংগৃহীত হয়। টি.আর. শ্যালেনবার্গ আর্কাইভস-এর আধুনিক সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, যে কোনো সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেই সকল নথিপত্র যেগুলি কোনো গবেষণায় তথ্য-উপাত্ত হিসেবে প্রয়োগের উদ্দেশ্যে স্থায়ী সংরক্ষণের উপযুক্ত বলে বিবেচনা করে সেভাবে কোনো সংগ্রহশালায় রক্ষিত হয়েছে বা রক্ষণের জন্য বাছাই করা হয়েছে। আর্কাইভ এখন একটা দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণাগার; একটা জাতির স্মৃতিময় তথ্যের ভান্ডার।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পরে পূর্ব-বাংলা সরকার এবং পরবর্তীকালে পূর্ব-পাকিস্তান সরকার অনুরূপভাবে দলিলপত্র সৃষ্টি এবং সংরক্ষণ করে। তবে এ সময়কালের বেশির ভাগ রেকর্ডপত্র এখনও জাতীয় আর্কাইভসে এসে পৌঁছায় নি। বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভসে (ন্যাব) দেশবিভাগের সময় পূর্ববঙ্গ সরকারের নিকট হস্তান্তরিত আসাম সরকারের (১৮৭৫-১৯৪৭) বেশ কিছু দলিলপত্র সংরক্ষিত আছে। এগুলি মূলত সিলেট জেলা ও কাছাড় অঞ্চলের দলিলপত্র। বৃহত্তর সিলেট জেলা ১৮৭৪ সালে চীফ কমিশনার শাসিত আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং তখন থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত (১৯০৫ হতে ১৯১১ পর্যন্ত সময়কাল ব্যতীত) আসামের অংশ হিসেবে থাকে। সিলেটকে আসামের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তির ফলে সিলেটবাসীর ক্ষোভ, সিলেট ও কাছাড় অঞ্চলে ব্রিটিশ আমলের উন্নয়ন কর্মকান্ড, বিশেষ করে চা উৎপাদন ইত্যাদি বিষয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এ দলিলপত্রে বিবৃত রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কৃষি, বিচার, রাজস্ব, স্থানীয় সরকার, গণপূর্ত, শুমারি ও সাধারণ বিভাগীয় ও নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়াদি। জুলাই ২০০০ অব্দি জাতীয় আর্কাইভস-এ সংরক্ষিত মোট নথিপত্র ও দলিলাদির সংখ্যা ৭ লক্ষের উপর। এ সকল ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংগৃহীত হয়েছে বাংলাদেশ সচিবালয় রেকর্ডরুম, দেশের বিভিন্ন জেলার সরকারি রেকর্ডরুম এবং ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা থেকে। এগুলির অধিকাংশ ব্রিটিশ আমলের বাংলা ও আসাম, পাকিস্তান আমলের পূর্ব পাকিস্তান (১৯৪৭-৭১) ও বাংলাদেশ আমলের সরকারি নথিপত্র। এতদ্ব্যতীত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ হচ্ছে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের নথিপত্র, বিভিন্ন জেলার ডেপুটি কমিশনারদের নথিপত্র এবং জয়দেবপুরের ভাওয়ালরাজ ও ঢাকার নওয়াব পরিবারের রেকর্ডপত্র। ন্যাব সংগ্রহশালায় আরও আছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ এর পুরনো বহু নথিপত্র এবং ১৯৫০ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত বিলুপ্ত দৈনিক বাংলা এর সকল প্রকাশনা, যার মধ্যে রয়েছে সংবাদপত্র, জার্নাল ও বিভিন্ন ক্রোড়পত্র। ন্যাবে বিশেষ উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ হলো ব্রিটিশ ভারতের বাংলা সরকারের কার্যবিবরণী ও নথির ভল্যুমসমূহ, এবং এগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক লেনদেন ও পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যাবলি বিষয়ক নথিপত্রাদি। ঐগুলি ব্যতীত প্রাদেশিক গভর্নরের নেতৃত্বাধীনে নির্বাহি কাউন্সিলের পত্রাদি, আদেশাবলি, সিদ্ধান্তসমূহও রয়েছে। ন্যাব ১৯৭৩ সাল থেকে ‘দি বাংলাদেশ গেজেট’ এবং ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলাদেশ বেতার এর প্রতি দিনের রেডিও মনিটরিং সংরক্ষণ করে যাচ্ছে। এগুলি সাম্প্রতিক কালের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইতিহাসের মূল্যবান উৎস। আরেকটি উৎকৃষ্ট সংগ্রহ হলো দেশ-বিদেশের খবরের কাগজ, জার্নাল ও সাময়িকীর পূর্বের প্রকাশনা।ন্যাবের পুরোনো সংগ্রহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রায় বিশ হাজার ঐতিহাসিক সরকারি নথিপত্র। ঐসব নথিপত্রে রয়েছে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের অফিস থেকে প্রেরিত নথিসমূহ, কমিশনারের মাধ্যমে সরকারের সাথে জেলা পর্যায়ের অফিসসমূহের যোগাযোগ এবং সরকারের নিকট থেকে কমিশনারদের অফিস হয়ে জেলা পর্যায়ে প্রেরিত নিদের্শাবলি। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলির মধ্যে ন্যাব দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ক সেমিনার নিয়মিতভাবে আয়োজন করে থাকে। এছাড়াও ন্যাব কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে অটোমেশন সেবা এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে এর তথ্যাদি ও সংগ্রহ প্রচারের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

আরকাইভসের গুরুত্ব তুলে ধরতে ১৯৪৮ সালের এ দিনে ইউনেস্কোর অঙ্গ সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন আর্কাইভস (আইসিএ) যাত্রা শুরু করে। ২০০৪ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় বিশ্বব্যাপী আর্কিভিস্টদের বা নথিরক্ষকদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ থেকে দুই হাজার প্রতিনিধি যোগ দেন। সম্মেলন শেষে তাঁরা একটি সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা জাতিপুঞ্জকে (ইউনাইটেড নেশন্স) অনুরোধ করবেন যেন বিশ্বব্যাপী একটি দিবস ‘আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। এরই মধ্যে বেশ কিছু দেশ তাদের দেশে ‘জাতীয় আর্কাইভস’ বা জাতীয় দলিলপত্র দিবস পালন করছে। দিবসটি পালন করার উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের মধ্যে আর্কাইভস বা দলিলপত্র সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং একই সঙ্গে দেশের নীতিনির্ধারকদের আর্কাইভসের গুরুত্ব সম্পর্কে ওয়াকিফহাল করানো। ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরি আর প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের সামনে আর্কাইভসের গুরুত্ব তুলে ধরার জন্যই এ দিবসের সূচনা করে আইসিএ। মূলত ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন আর্কাইভস (আইসিএ) এর উদ্যোগে ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছরের ৯ জুন দিবসটি পালিত হচ্ছে। আর্কাইভস দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘আর্কাইভের ক্ষমতায়ন’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, আর্কাইভস নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা স্পষ্ট নয়। আর্কাইভস কেন স্থাপন হল, এতে কী আছে, কী কাজ হয়- তা সাধারণ মানুষ কি শিক্ষিত সমাজই সঠিকভাবে অবহিত নন। আর্কাইভসের গুরুত্ব জনগণকে সঠিকভাবে বোঝাতে না পারলে ইতিহাসের সংরক্ষিত দলিল-দস্তাবেজ ‘ধূলিধূসর হয়ে পড়ে থাকবে। যদিও তথ্যভাণ্ডার ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে ১৯৭২ সাল থেকে জাতীয় আরকাইভস কাজ করে আসছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের নভেম্বরে আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। জাতীয় আরকাইভস আজ বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জাতীয় আরকাইভসের সংগ্রহশালায় রক্ষিত পুরাতন নথিপত্র দেশ-বিদেশের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, গবেষকসহ সর্বস্তরের জনসাধারণের নিকট গ্রহণযোগ্য ইতিহাস চর্চার অমূল্য দলিল। দুঃখের বিষয়আমাদের জাতীয় আর্কাইভস যতটুকু সমৃদ্ধ হওয়ার কথা ছিল ততটুকু হয়নি। এযাবৎ যেসব আর্কাইভস গড়ে উঠেছে তা সনাতনিভাবেই গড়ে উঠেছে। আর এগুলো সবই হচ্ছে কাগজে লেখা নথি দলিলপত্র। তাছাড়া বেসরকারি খাতে আর্কাইভস এখনো বহু পিছিয়ে আছে। আমরা একবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশে আর্কাইভস গড়ে তুলতে চাই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে। এর বহুল প্রচারও দরকার। সনাতনি প্রথায় যেভাবে আর্কাইভস গড়ে উঠেছে তাকে আরো সাবলীল করে তোলা এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা। আজকের সৃষ্ট নথিপত্রই আগামী দিনের ঐতিহাসিক দলিল তথা মূল্যবান আরকাইভাল উপকরণ বলে বিবেচিত হবে। আজ আন্তর্জাতিক আর্কাইভস দিবসটি পালনের মাধ্যমে আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফতর আরকাইভসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে সমর্থ হবে।’
সূত্রঃ আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম:-&ফেসবুক-১:-&ফেসবুক-২
nuru.etv.news@gmail.com

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.