ভূমি অফিসের সীমাহীন দূর্ণিতির লাগাম টানতে আলোর পথে ভূমি ব্যবস্থাপনা

ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারই সম্পৃক্ত। ভূমিসেবা নিতে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ ও হয়রানির শিকার হতে হতো। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, তাই ভূমি সেবা ছিল ব্যয়বহুল। তবে ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে এই পরিস্থিতি। তাই ডিজিটাল পদ্ধতির হাত ধরে মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ ও হয়রানি থেকে মুক্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে ভূমি ব্যবস্থাপনা। ভূমি অফিসের দুর্নীতি কমানো এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য এখন থেকে ঘরে বসেই অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর, মিউটেশন ফি, খতিয়ান ফিসহ যাবতীয় ফি পরিশোধ করা যাবে। ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জনগণের হয়রানি লাঘব, অনিয়ম দুর্নীতি বন্ধ ও সরকারি রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য বিকাশ, নগদ, উপায় ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের সঙ্গে সমঝোতাস্মারক সই করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। সমঝোতা স্মারক সই অনুষ্ঠানে জানানো হয়, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর, মিউটেশন ফি, খতিয়ান ফিসহ যাবতীয় ফি পরিশোধে অ্যাপ্লিকেশন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই অনলাইনে সব ফি দিতে পারবেন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সব সেবা স্থাপনের জন্য ভূমিসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয়, পেমেন্ট গেটওয়ে চ্যানেল সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান উপায়, নগদ ও বিকাশ এবং ব্যাংকিং সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের (ইউসিবিএল) মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে ইউসিবিএল হবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়কারী তথা সেটেলমেন্ট ব্যাংক। বাংলাদেশের নাগরিকরা উপায়, নগদ, বিকাশ ও অন্য পেমেন্ট গেটওয়ে চ্যানেলের মাধ্যমে তাদের জমির বিভিন্ন ফি দিতে পারবেন। ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আমাদের লক্ষ্য দুর্নীতি কমানো এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। হিউম্যান টু হিউম্যান টার্চ কমাতে চাচ্ছি। আমরা স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি- এই তিনের সমন্বয়ে মন্ত্রণালয়ের কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।

গতকাল সোমবার (২৪ মে) সকালে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এই চারটি আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার দাস, বিকাশের জেনারেল ম্যানেজার বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এসএম বেলাল আহমেদ, নগদের পক্ষে চিফ ইনফরমেশন অফিসার আশীষ চক্রবর্তী, উপায়ের পক্ষে সাইফুল হক এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের পক্ষে অ্যাক্টিং ম্যানেজিং ডিরেক্টর আরিফ কাদরি। এ সময় ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, ভূমি সচিব মোস্তাফিজুর রহমান, ভূমি সংস্কার কার্যালয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামালসহ ভূমি মন্ত্রণালয়ের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ভূমি সচিব মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে ভূমিকেন্দ্রিক নানা সেবা ডিজিটাইজেশন করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে ই-পর্চা (খতিয়ান), ই-নামজারি (ই-মিউটেশন) ও ভূমি উন্নয়ন কর (এলডি ট্যাক্স) তথা জমির খাজনা। জমির অন্য সেবাগুলো পর্যায়ক্রমে অনলাইন সেবার আওতায় আসবে। ফলে নাগরিকরা তার জমি সম্পর্কিত কর ও ফি অনলাইনে দিতে পরিশোধ করতে পারবেন। তিনি বলেন, পুরো বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকবে। ফি পরিশোধের পর ভূমিসেবা গ্রহীতারা কিউআর কোড যুক্ত রশিদ পাবেন এবং সেবাটি গ্রহণ করতে পারবেন। উপায়, বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে আদায় করা অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে সেটেলমেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হয়ে ই-চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে স্থানান্তরিত হবে। অনলাইন সেবা পেতে জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধন শেষে সেবাটি গ্রহণ করা যাবে। আগামী সপ্তাহ থেকে সারা দেশে এর রেজিস্ট্রশন প্রক্রিয়া শুরু হবে। আগামী জুলাই থেকেই পুরোদমে অনলাইনে ভূমি কর আদায় কার্যক্রম শুরু হবে। রেজিস্ট্রশন প্রক্রিয়া শুরুসহ অনলাইনে ভূমি কর আদায়ের নির্দেশনা দিয়ে বৃহস্পতিবার (২০ মে) মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সব জেলা প্রশাসনকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় একটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেছে। এই প্লাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই অনলাইনে ভূমি কর প্রদান করতে পারবেন। জেলা প্রশাসনকে পাঠানো নির্দেশনা থেকে জানা গেছে, অনলাইনে ভূমি কর প্রদান করতে হলে ভূমির মালিককে প্রথমে নিবন্ধন করতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন নম্বরসহ অন্যান্য তথ্য প্রদান করে নিবন্ধিত হতে হবে। একবার নিবন্ধিত হলে ওই ব্যক্তিকে ভবিষ্যতে আর নিবন্ধন করার দরকার হবে না। তিন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা যাবে এই নিবন্ধন। তিনটি উপায়ে রেজিস্ট্রেশন করা যাবে জানিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ওয়েবসাইটে ঢুকে সরাসরি করা যাবে, ডিজিটাল সেন্টারে গিয়ে করা যাবে। কল সেন্টারে ফোন করেও রেজিস্ট্রেশন করা যাবে, এটা নতুন একটা মাত্রা।

১. অনলাইন পোর্টাল land.gov.bd অথবা http://www.ldtax.gov.bd -এ প্রবেশ করে এনআইডি ও মোবাইল ফোন নম্বর এবং জন্ম তারিখ এন্ট্রি করার মাধ্যমে।
২. কল সেন্টার নম্বর ৩৩৩ বা ১৬১২২-তে ফোন করে এনআইডি নম্বর, জন্ম তারিখ ও জমির তথ্য প্রদান করে। এবং
৩. এনআইডি ব্যবহার করে যে কোনও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে। আগামী সপ্তাহ থেকে সারা দেশে এর রেজিস্ট্রশন প্রক্রিয়া শুরু হবে। আগামী জুলাই থেকেই পুরোদমে অনলাইনে ভূমি কর আদায় কার্যক্রম শুরু হবে।

উল্লেখ্য, নিবন্ধনবিহীন ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি অফিসে খাজনা প্রদানের জন্য গেলে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা প্রথমেই তার সকল ডাটা এন্ট্রি করবেন। পাশাপাশি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নিজ উদ্যোগে হোল্ডিং মালিকদের তথ্য এন্ট্রি করবেন। নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নিজে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বসেই এলডি ট্যাক্স সিস্টেমে অন্যান্য ডাটা অনলাইনে এন্ট্রি করবেন। এন্ট্রি দেয়ার পর তিনি মোবাইলে এসএমএস পাবেন। এসএমএস পাওয়ার পর উনি যখনই জানতে চাইবেন আমার খাজনা কত, তাকে মোবাইলে তা জানিয়ে দেয়া হবে, একটা টোকেন নম্বর দেয়া হবে। সেই নম্বর দিয়ে যে কোন এমএফএসে (মোবাইল ব্যাংকিং) ঢুকে নম্বর উল্লেখ করে পেমেন্ট দিলে আমরা সিস্টেম বুঝে ফেলব এটা এই লোকের অত সালের খাজনা। একযোগে সারা দেশে অনলাইনে খাজনা আদায় শুরু হবে উল্লেখ করে সচিব বলেন, ‘আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শুরু হবে। যার রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে তিনি খাজনা দিতে পারবেন।’ ভূমি সচিব মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এই পদ্ধতি চালুর ফলে মানুষকে আর তহশিল অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। তহশিল অফিসের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ করা গেলে দুর্নীতি অর্ধেকই কমে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘এছাড়া এই প্রক্রিয়ায় আমাদের শতভাগ ভূমি কর আদায় হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যকার অর্থ তসরুপ বা রাজস্ব আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে, সেটা বন্ধ হবে।’ ভূমি সচিব বলেন, ‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে একজনের খাজনা অন্য জনে দিয়ে পরে টেম্বারিং করে, সেই জমি তার দাবি করার তথ্য অনেক সময় আমাদের কাছে আসে। অনলাইনে খাজনা আদায় করা গেলে এই বিষয়টিও বন্ধ হবে।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম:-&ফেসবুক-১:-&ফেসবুক-২
nuru.etv.news@gmail.com

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.