বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস আজঃ ‘তামাক করে হৃৎপিণ্ডের ক্ষয়: স্বাস্থ্যকে ভালোবাসি, তামাককে নয়’

Toba 01
৩১ শে মে, ২০১৮, বৃহস্পতিবারঃ
৩১ মে বিশ্বের প্রতিটি দেশে পালিত হয় বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস। ১৯৮৭ সাল থেকে প্রতিবছর এই দিনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এর সহযোগী সংস্থাসমূহের উদ্যোগে তামাক ব্যবহার প্রতিরোধে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে ‘বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও আজ নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছরে দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘তামাক করে হৃৎপিণ্ডের ক্ষয়: স্বাস্থ্যকে ভালোবাসি, তামাককে নয়।’ তবে ঢাকঢোল পিটিয়ে এই দিবস পালিত হলেও এবং সবাই এর ক্ষতিকর প্রভাব জেনেও এর মোহ কাটাতে পারছেনা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হৃদরোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১২ শতাংশের জন্য দায়ি তামাক ব্যবহার এবং পরোক্ষ ধূমপান। হৃদরোগের কারণ হিসেবে উচ্চ রক্তচাপের পরেই তামাক ব্যবহারের অবস্থান। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত হেলথ বুলেটিন ২০১৭ এর তথ্য মতে, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সময়কালে জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের বহির্বিভাগে সেবা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৪১.৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দ্য ইন্সটিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (আইএইচএমই)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৬ সময়কালে বাংলাদেশে অকাল মৃত্যুর কারণের তালিকায় হৃদরোগ ৭ম স্থান থেকে ১ম স্থানে উঠে এসেছে এবং এই পরিবর্তনের হার ৫২.৭ শতাংশ। আর এই মৃত্যুর জন্য দায়ি হিসেবে তামাকের অবস্থান ৪র্থ। অথচ তামাক সেবনকারীরা যদি তাদের তামাকের ব্যয়ের ৬৯ শতাংশ অর্থ দিয়ে খাদ্য কেনে তবে অপুষ্টিজনিত মৃত্যু অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব।

কি জানি কি করে কোনো মোহের ছলনায় তারুণ্য বারংবার বিভ্রান্ত হয়েছে মাদকের গোলক ধাঁধায়। অনেক সম্ভাবনার অকাল প্রয়াণ যেমন ঘটে মাদকের জন্য তেমনি স্তিমিত হয়ে যায় কত না প্রাণোচ্ছ্বাস। অসময়ে মৃত্যু কখনই গ্রহণযোগ্য বা কাম্য নয় কারও কাছে। তারপরেও নিত্যদিনই নতুন নতুন ধূমপায়ীর সংখ্যা বাড়ছে। কিছুদিন পূর্বে প্রকাশিত হওয়া এক প্রতিবেদনে ভয়াবহ এক তথ্য উঠে এসেছে, তা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ই প্রতি মাসে কোটি টাকার অধিক সিগারেট বিক্রি হয়। আর এর ৯০ শতাংশই হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী। বাংলাদেশে ৪৩ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি ১৩ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক সেবন করেন। তিনি বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের হার নারীদের মধ্যে অনেক বেশি। বাংলাদেশে ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সের প্রায় ৭ ভাগ (পরিসংখ্যান, ২০১৩) কিশোর-কিশোরী তামাক ব্যবহার করে। ধুমপানের কারণে প্রতিদিনই নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অজস্র তরুণের স্বপ্ন। এক নিরীক্ষায় দেখা গেছে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী ধূমপায়ীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ হিসেবে যে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা, সেগুলো হলো কৈশোর কিংবা তারুণ্যের অহেতুক খেয়ালিপনা, বন্ধুদের অসৎ প্ররোচনা, পারিবারিক দায়িত্বহীনতা, বাবা-মায়ের সম্পর্কের বিচ্ছেদ, প্রেমের ব্যর্থতা, নায়কোচিত মনোভাব, অতি আধুনিকতার ব্যর্থ চিন্তা, নিঃসঙ্গতা, সৃজনশীলতার বিকাশ মনে করা ইত্যাদি।প্রেমে ব্যর্থ হলেই মদ গিলতে হবে কিংবা মাদক গ্রহণ করে জীবনকে দুর্বিষহ করতে হবে এমন মনোভাব কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। যে ছেলেটি কিংবা মেয়েটি আপনার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে তার জন্য অশ্রুর রোদন থাকতে পারে, স্মৃতিকাতরতার আস্ফালন থাকতে পারে, কিন্তু মাদক গ্রহণ করে তাকে ভুলে থাকার ইচ্ছেটার কোনো মানে হয় না। মনে রাখতে হবে যে ভুলে যায়, সে তো ভালোই থাকে। তাই আপনার ভালো থাকতে দোষটি কোথায়? অন্যদিকে কেউ কেউ মাদককে সৃজনশীল কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মনে করেন, যা হাস্যকর বৈ কিছু নয়। কৈশোরে অজানাকে জানার অহেতুক কৌতূহলে যে নামটি বিষাক্ত অজগর হয়ে গিলে ধরে সবাইকে, তা হলো সিগারেট। নিজেকে জাহির করা, কখনো অভিমান, হতাশা আর নিঃসঙ্গতার সঙ্গী খোঁজার ছলে দুই আঙুলের ফাঁকে আটকে যায় সিগারেট। সহজ নিঃশ্বাসের দরজায় ঢুকিয়ে দেয় বিষাক্ত খিল। তারুণ্যের মুগ্ধ পথচলায় মাদক প্রায়শই রোদেলা দুপুরের আলোতে গোধূলি হয়ে দেখা দেয়। সিগারেটে আসক্ত হলে যে রোগগুলো হতে পারে সেগুলো হলো ফুসফুসে ক্যান্সার, উচ্চরক্ত চাপ, গলব্লাডারের ক্যান্সার, মুখের ক্যান্সারসহ চুল পড়ে যাওয়া, ঠোঁট ও দাঁতের মাড়ি কালো হওয়া ছাড়াও সিগারেটের আলকাতরা জাতীয় পদার্থ গলা থেকে মুখাবয়বের সৌন্দর্যহানি ঘটায়। ফুসফুস সব সময়ই নির্মল বাতাস নিতে চায়। কিন্ত ধূমপায়ীরা তার বদলে দেয় নিকোটিনের কালো ধোঁয়া। ফুসফুসকে প্রতিনিয়ত নির্মল বাতাস গ্রহণ করতে দিন। সব দ্বিধা, ভুলকে প্রশ্রয় না দিয়ে সিগারেট তথা মাদককে না বলুন। 

কারন মাদক কখনই বন্ধু হতে পারে না। সিগারেটের সঙ্গে কোনো রোমাঞ্চ থাকতে পারে না।শুধু মাদকই একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। যে তরুণ সমাজ আজ মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকছে, তারাই কিন্তু ভবিষ্যতের নেতৃত্ব। জীবন সুন্দর, তাই সুন্দরকে আলিঙ্গন করুন ভালোবেসে। মাদক থেকে একজন তরুণকে ফেরাতে পারে তার পরিবার। সন্তানদের প্রতি বাবা-মা’র কর্তব্য সঠিকভাবে হওয়া উচিত। গাইডনেস ব্যাপারটি তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাবাকে সিগারেট টানতে দেখে অনেক সন্তান এই বস্তুটির মোহে পড়ে যায়। তাই পিতার দায়িত্ব রয়েছে সন্তানকে সিগারেটে আসক্ত না করার বিষয়ে। তাদেরকে বোঝাতে হবে তামাক কখনই কারো বন্ধু না। “তামাক করে হৃৎপিণ্ডের ক্ষয়, স্বাস্থ্যকে ভালোবাসি, তামাককে নয়”। দুনিয়াজুড়ে মাদকবিরোধী প্রচারণা সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। মাদক নিয়ে অসংখ্য সভা, মজার বিষয় হলো এই প্রচারণাগুলোতে বহু ধূমপায়ী অংশ নিয়ে থাকে। সেমিনার আর গোলটেবিল বৈঠক হলেও মাদকের ব্যবহার কখনই কমেনি। সিগারেট দিয়েই মূলত মাদকের শুরু হয়। তারপর ক্রমান্বয়ে গাঁজা, চরশ, ফেনসিডিল, হিরোইন, পেড্রোথিন আরও কত কি। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবা শব্দটি নেশার জগতকে খুব আলোড়িত করেছে। উচ্চ মধ্যবৃত্ত ও ধনী পরিবারের মাদকাসক্ত তরুণদের কাছে ইয়াবা বেশ পরিচিতি পেলেও এর ধ্বংসাত্বক বিষয়ে কতটা ভয়াবহ তা ইতোমধ্যেই অনেকের মাঝে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ তামাক বিরোধী সংগঠনগুলো মনে করে, বিগত দিনে দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ ক্ষেত্রে এফসিটিসি স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষর, আইন ও বিধিমালা প্রনয়ন এবং আইন সংশোধন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনেক অর্জন রয়েছে। জনস্বার্থে দেশেআইন ও বিধিমালা প্রণীত হলেও কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন আরো অগ্রগতি। তামাক নিয়ন্ত্রণে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতি পদক্ষেপে মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে। এই যুদ্ধে জয় লাভ করতে পারলে বাংলাদেশ থেকে মাদকের ব্যবহার, বিস্তার রোধ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এবারের বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবসে আমাদের উপলব্ধি হোক “তামাক করে হৃৎপিণ্ডের ক্ষয়: স্বাস্থ্যকে ভালোবাসি, তামাককে নয়”।

নুর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
nuru.etv.news@gmail.com

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.