বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ইতালীয় চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ৫৬৫তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের শুভেচ্ছা

লঞষ

১৫ ই এপ্রিল, ২০১৮, রবিবারঃ ইতালীয় রেনেসাঁসের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ইতালীয় চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। মানব সভ্যতার ইতিহাসে যদি পূর্ণ হিসাবে কারও নাম বিবেচনা করতে হয়, তবে একটি নাম উচ্চারণ করতে হয়, তিনি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। লিওনার্দোকে পৃথিবীর বেশিরভাগই মানুষই চেনে শুধুমাত্র “মোনালিসার” কারণে। এ ছাড়া তার ড্রেফাস ম্যাডোনা, দ্য ক্যাপটিজম অব খ্রিস্ট, দ্য ম্যাডোনা অব দ্য কারনেশন, বেনোইস ম্যাডোনা, দ্য অ্যাডোরেশন অব দ্য মেজাই, লেডি ইউথ অ্যান আরমাইন ও দ্য ব্যাটল অব আনসিয়ারির মতো অনেক চিত্রকর্ম রয়েছে। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, স্হপতি, সঙ্গীতজ্ঞ, সমরযন্ত্রশিল্পী এবং বিংশ শতাব্দীর বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নেপথ্য জনক। এ ছাড়াও লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আরেকটি অদ্ভুত শখ ছিল, সেটা হল খাঁচাভর্তি পাখি কেনা। আর তার চেয়েও মজার বিষয় হল পাখিগুলো তিনি কিনতেন এ জন্যই যেন তিনি সেগুলো মুক্ত করে দিতে পারেন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই ইতালীয় চিত্রশিল্পীর আজ ৫৬৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৪৫২ সালের আজকের দিনে তিনি ইতালীর ফ্লোরেন্সে জন্মগ্রহণ করেন। কালজয়ী চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির জন্মদিনে আমাদের শুভেচ্ছা। 

লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ১৪৫২ খ্রীষ্টাব্দের ১৫ এপ্রিল ইতালীর ফ্লোরেন্সের অদূরবতী তুসকান এর পাহাড়ি এলাকা ভিঞ্চি তে, আর্নো নদীর ভাটি অঞ্চলে জন্ম গ্রহণ করেন। লিওনার্দোর জীবনের প্রথম অংশ বিষয়ে খুবই অল্প জানা গিয়েছে। তার সৃষ্ট চিত্রকর্ম মোনালিসার মতোই তিনি নিজেও ছিলেন রহস্যময়। তিনি ছিলেন ফ্লোরেন্সের এক নোটারী পিয়েরে দ্য ভিঞ্চির এবং এক গ্রাম্য মহিলা ক্যাটরিনার অবৈধ সন্তান। তাঁর মা সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত দাসী ছিলেন। আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে লিওনার্দোর নামে কোন বংশ পদবী ছিল না। “দ্য ভিঞ্চি” দিয়ে বোঝায় তিনি এসেছেন ভিঞ্চি নগরী থেকে। তাঁর পুরো নাম “লিওনার্দো দাই সের পিয়েরো দা ভিঞ্চি” এর অর্থ হল পিয়েরোর পুত্র লিওনার্দো এবং সে জন্মেছে ভিঞ্চিতে। ভিঞ্চি শৈশব থেকেই প্রচন্ড মেধাবী ছিলেন। গনিতে তার এতোটাই দক্ষতা ছিল যে , শিক্ষকরা পর্যন্ত কখনো কখনো বিভ্রান্ত হয়ে যেতো তাকে পড়াতে গিয়ে। তার প্রশ্নের পর প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে শিক্ষকরা ক্লান্ত হয়ে যেতো। 

(১৫১২-১৫১৫ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে লাল খড়িতে আঁকা ভিঞ্চির আত্মপ্রতিকৃতি)
শুধুমাত্র গনিতই নয়, সংগীতেও তার আকর্ষণ ছিল। তার কন্ঠস্বর ছিল সুমিষ্ট। পরবর্তীকালে যখন তিনি বাঁশি বাজাতেন এক স্বর্গীয় সুষমায় ভরে উঠত সমস্ত পরিমণ্ডল। তাঁর জীবনের প্রথম ৫ বছর কেটেছে আনসিয়ানো-র একটি ছোট্ট গ্রামে। তারপর তিনি চলে যান ফ্রান্সিসকো তে তার পিতা,দাদা-দাদী ও চাচার সাথে থাকতে। তার পিতা অ্যালবিরা নামে এক ষোড়শী তরুণী কে বিয়ে করেছিল। সে লিওনার্দো কে অনেক স্নেহ করত। কিন্তু অল্প বয়সেই সে মৃত্যবরন করে। ষোড়শ শতাব্দীর জীবনী লেখক ভাসারি রেঁনেসার চিত্রশিল্পীদের জীবনী লিখেছিলেন। লিওনার্দো কে নিয়ে তিনি তাঁর বর্ননায় বলেছেন-লিওনার্দো-র বাবা কে স্থানীয় একজন লোক বলেছিল তিনি যেন তার ছেলেকে একটি ছবি আঁকতে বলেন। লিওনার্দো এই অনুরোধের প্রেক্ষিতে একটি ছবি এঁকেছিল। এতে ছিল একটি সাপের মুখ থেকে আগুন নির্গত হচ্ছে। ছবিটি এত সুন্দর হয়েছিল যে পিয়েরো তা স্থানীয় চিত্র ব্যবসায়ীদের কাছে তা বেশ ভাল দামে বিক্রি করেছিলেন। আর যে লোকটি তাঁকে এ ছবিটি আঁকিয়ে নিতে বলেছিল, তিনি তাকে একটি হৃদয়ের ছবি আঁকা ফলক উপহার দিয়েছিলেন।

১৪৬৬ সালে লিওনার্দোর বয়স যখন ১৪, তখন তিনি ভ্যারিচ্চিও (Verrocchio)-র কাছে শিক্ষানবীশ হিসেবে যোগ দেন।ভ্যারিচ্চিও-র পুরো নাম “আন্দ্রে দাই সায়ন”, তিনি ছলেন সে সময়ের একজন সফল চিত্রকর। এখানে কাজ করে লিওনার্দো হাতে কলমে প্রচুর কারিগরি জ্ঞানার্জন করেছিলেন। তার সুযোগ হয়েছিল কারুকার্য, রসায়ন, ধাতুবিদ্যা, ধাতু দিয়ে বিভিন্ন জিনিস বানানো, প্রাস্টার কাস্টিং, চামড়া দিয়ে বিভিন্ন জিনিস বানানো, গতিবিদ্যা এবং কাঠের কাজ ইত্যাদি শেখার। তিনি আরও শিখেছিলেন দৃষ্টিনন্দন নকশাকরা, ছবি আঁকা, ভাস্কর্য তৈরি এবং মডেলিং। ভ্যারিচ্চিও-র ওয়ার্কশপে বেশিরভাগ কাজ করত তার অধস্তন কর্মচারীরা। ভাসারীর বর্ননানুসারে লিওনার্দো ভ্যারিচ্চিও কে তার “ব্যাপ্টিজম অব ক্রাইস্ট” ছবিটিতে সাহায্য করেছিলেন। ছবিটিতে দেখানো হয়েছে একটি দেবদূত যীশুর লাঠি ধরে আছে। ছবিটি ভ্যারিচ্চিও কে এতটাই অভিভূত করেছিল যে তিনি নাকি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর কখনো তুলিই ধরবেন না, ছবিও আঁকবেন না। তবে খুব সম্ভবত ভাসারি ঘটনাটি অতিরঞ্জিত করেছিলেন। সূক্ষ্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এ ছবিটির যে সব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয় তা হল- এটি বিশেষ পদ্ধতিতে তৈল রং দিয়ে আঁকা। ভ্যারিচ্চিও বেশ কয়েকটি কাজে লিওনার্দো মডেল হিসেবে ছিলেন। যেমন- “ডেভিড” চরিত্রে “দি বার্জেলো” ( Bargello) নামক ব্রোঞ্জ মূর্তিতে, “আর্চঅ্যাঞ্জেল মাইকেল” হিসেবে “টোবিস এন্ড অ্যাঞ্জেল“(Tobias and the Angel) এ।

(লিওনার্দোর আঁকা বিশ্বখ্যাত মোনালিস)
১৪৭৮ সাল থেকে ১৫১৬-১৭ ও ১৫১৯ সাল অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত প্রসারিত এবং বিভিন্ন পর্বে বিভক্ত, এক দীর্ঘ ও অক্লান্ত কর্ম সাধনার জীবন তাঁর। গির্জা ও রাজপ্রাসাদের দেয়ালে চিত্রাঙ্কন এবং রাজকীয় ব্যক্তিবর্গের ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি বেসামরিক এবং সামরিক প্রকৌশলী হিসাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান জ্ঞানের প্রয়োগ, অঙ্গব্যবচ্ছেদবিদ্যা, জীববিদ্যা, গণিত ও পদার্থবিদ্যার মত বিচিত্র সব বিষয়ের ক্ষেত্রে তিনি গভীর অনুসন্ধিৎসা প্রদর্শন করেন এবং মৌলিক উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দেন। ১৪৭২ সালে ২০ বছর বয়সে লিওনার্দো “গিল্ড অব সেন্ট লুক” এর পরিচালক হবার য্যোগ্যতা অর্জন করেন। এটি চিকিৎসক এবং চিত্রকরদের একটি সংঘ্য। কিন্তু তার বাবা তাকে নিজেদের ওয়ার্কশপের কাজে লাগিয়ে দেন। ভ্যারিচ্চিওর সাথে চুক্তি অনুসারে তিনি তার সাথেও কাজ চালিয়ে যান। এরপর ১৪৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি কি করেছিলেন, কোথায় ছিলেন তার কিছুই জানা যায়নি। ধারণা করা হয় পরবর্তিতে ১৪৭৮ থেকে ১৪৮১ পর্যন্ত লিওনার্দো তার নিজের ওয়ার্কশপে কাজ করেছে। তিনি ১৪৭৮ সালে চ্যাপেল অব সেন্ট বার্নার্ড ও “অ্যাডোরেশন অব দি ম্যাগি” এবং ১৪৮১ সালে “মঙ্ক অব সান ডোনাটো এ স্কাপিটো” আঁকার দায়িত্ব পান। আনুমানিক ১৪৮২ সালে তিনি মিলান গমন করেন এবং সেখানে অবস্থানকালে তাঁর বিখ্যাত দেয়াল চিত্র দ্য লাস্ট সাপার অঙ্কন করেন।

(লিওনার্দোর আঁকা দ্যা লাস্ট সাপার)
এখানে তিনি ভার্জিন অব দ্যা রকস্ এবং দ্যা লাস্ট সাপার ছবি দুটি আঁকার দায়িত্ব পান। ভাসারির মতে লিওনার্দো সে সময়ের সেরা সংগীতজ্ঞ ছিলেন। ১৪৮২ সালে তিনি ঘোড়ার মাথার আকৃতির একটি বীণা তৈরি করেছিলেন। লরেঞ্জো দ্য মেডিসি (Lorenzo de’ Medici) লিওনার্দো-র হাতে এই বীনা উপহার স্বরূপ মিলানের ডিউক লুদোভিকো এল মোরো (Ludovico il Moro) এর কাছে পাঠিয়েছিলেন শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করার জন্য। এ সময় লিওনার্দো ডিউকের কাছে একটি চিঠি লিখেন, যাতে ছিল তার উদ্ভাবিত বিভন্ন চমকপ্রদ যন্ত্রের বর্ননা। তিনি এ চিঠিতে নিজের চিত্রশিল্পী পরিচয়ের কথাও লিখেছিলেন। ১৪৯৩ থেকে ১৪৯৫ এর মধ্যে তার অধিনস্তদের মাঝে ক্যাটরিনা নামে এক মহিলার নাম পাওয়া যায়। ১৪৯৫ সালে এ মহিলাটি মারা যান। সে সময় তার শেষকৃত্যের খরচ দেখে ধারণা করা হয় তিনি ছিলেন লিওনার্দোর মা। আনুমানিক ১৫০০ সালে তিনি ফ্লোরেন্স ফিরে আসেন এবং সামরিক বিভাগে প্রকৌশলী পদে নিয়োগ লাভ করেন। এই সময়েই তিনি তাঁর বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম মোনালিসা অঙ্কন করেন। জীবনের শেষকাল তিনি ফ্রান্সে কাটান। জীবনের শেষ দিকে এসে ক্রমশই তার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ছিল। ডান হাত অকর্মণ্য হয়ে গিয়েছিল। বা হাতেই ছবি আকতেন। তখন তিনি ঈশ্বরের প্রতি অনুরক্ত হন। ১৫১৯ সালের ২ মে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন এই কালজয়ী শিল্পী। বহুমুখী প্রতিভাধর ইতালীয় রেনেসাঁসের কালজয়ী এই চিত্রশিল্পীর ৫৬৫তম জন্মবার্ষিকী আজ। ভাস্কর, স্হপতি, সঙ্গীতজ্ঞ, সমরযন্ত্রশিল্পী এবং বিশ্ব বিখ্যাত শিল্পকর্ম মোনালিসা ও দ্য লাস্ট সাপার চিত্রের চিত্রকর লিওনার্দো দা ভিঞ্চির জন্মদিনে আমাদের শুভেচ্ছা।

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.